বাবার রক্তে বিজয়ের ভোর

You are currently viewing বাবার রক্তে বিজয়ের ভোর

দেবদারুর পাতায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি; বুলেটে ঝাঁঝরা  হচ্ছে সারি সারি মানুষের বুক। আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলছে পাবনার ডেমরা গ্রাম। ১৪ই মে ১৯৭১, অনেক লাশের স্তুপ পড়ে আছে পাকবাহিনীর ব্রাশফায়ারের পর। সবার মৃত্যু নিশ্চিত করার লক্ষ্যে লাশের বুকে খচাখচ চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে বেয়নেটের ধারালো ফলা। ফিনকি দিয়ে রক্তে ভিজে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণ পাড়া। যে কুমোরেরা একটু আগেও মাটিকে আগুনে পুড়িয়ে বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছিল, সেই আগুনে জ্বলছে এখন তাদের বসতভিটা।  মাটিতে রক্তের দাগ আর বাতাসে লাশের গন্ধ। নারী, বৃদ্ধ,  শিশু নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতন  চলছে।  যতটা আতঙ্কিত করলে বাঙালির বুক থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে মিটে যায় তার চেয়েও দুর্বিষহ অত্যাচার চলছে। 

লক্ষ্মী হালদার তার দুই বছরের শিশু বলাইকে নিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়েছে। আরও একজন লুকিয়ে ছিল অদূরেই। হঠাৎ পাক বাহিনীর বুটের শব্দ এগিয়ে গেলো ঐ লোকের দিকে।  টেনে হিঁচড়ে বের করে আনা হলো তাকে। লোকটি তৎক্ষণাৎ জীবন বাঁচানোর তাগিদে বলে উঠলো হুজুর, ঐখানে ঝোপের আড়ালে ইপিআর(লক্ষ্মী হালদার) লুকিয়ে আছে। হুজুর ও অনেক পয়সাওয়ালা লোক।  হুজুর ওকে ধরেন আর আমাকে ছেড়ে দেন। বাস্তবে লক্ষ্মী হালাদার ইপিআর ছিল না,  একজন সাধারণ জেলে মাত্র। নিজে বাঁচার জন্য মিথ্যে পরিচয় দিয়ে ধরিয়ে দিলো লক্ষ্মী হালদারকে।  দুই বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে অনেক কাকুতি-মিনতি করলো লক্ষ্মী হালদার।  বলল হুজুর আমি জলের পোকা(মাছ) ধরি, আমি খুব গরীব,  আমাদের মারবেন না। কথা শেষ হওয়ার আগেই চোখের নিচে বাম গাল বুলেটের আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেলো। 

বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মধ্যেই হঠাৎ নিরবতা,  নিস্তব্ধতা।  কাঁদামাটির উপর লাশ;  রক্ত আর কাঁদায় বিবর্ণ মাতৃভূমি। কিছুক্ষণ পর আরও একটি বুলেটের শব্দে ধরিয়ে দেওয়া লোকটিরও লাশ লুটিয়ে পড়ল।  শুধু অবুঝ শিশুটি রক্ষা পেলো বাবার লাশের বুকে। বাবা,  বাবা ওঠ;  বাড়ি চল।  বাবা,  বাবা ওঠ; বাড়ি চল।  কেঁদেই চলেছে শিশু বলাই।  আপ্রাণ চেষ্টা করছে বুক থাপড়ে বাবাকে উঠানোর।  অবুঝ শিশুটির চোখের জ্বল বৃষ্টির জ্বলে মিশে বাবার রক্তের ধারাতে মিলেছে।  সন্তানের চোখের জ্বল আর বাবার রক্ত একই মাতৃভূমিতে মিলেমিশে একাকার। দেবদারু গাছে লুকিয়ে থাকা লোকটি এই নির্মম-নিষ্ঠুর হৃদয়-বিদারক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেও তার কিছু করার ছিল না। সে রাতে ডেমরায় ৭৫০ জন নর-নারী শহীদ হয়েছিল। এমন অসংখ্য প্রাণাহুতির পর বিজয়ের ভোরে যে সূর্যটি উঠেছিল তাতে ঐ শিশুটির বাবারও লাল রঙ আছে,  আছে শিশুটির অশ্রুপাতের ধারা।   

 

উৎপল কুমার, প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ

শাহজাদপুর সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ।

Leave a Reply